২৬ নভেম্বর ২০২০ ইং, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম:
শিবপুরের কুখ্যাত ইয়াবা সম্রাট কে এই আরিফ প্রসাশনের ধরাছোয়ার বাহিরে। নরসিংদীতে গোয়েন্দা পুলিশের পৃথক পৃথক অভিযানে ৫৪৫ পিস ইয়াবাসহ চিহ্নিত ৫ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার নরসিংদীর রায়পুরায় ৪ কেজি গাঁজাসহ চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী পপি ডিবি পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার শিবপুরে পাহাড়ি লালমাটি রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা।

মানবপ্রেমী নরসিংদী সদর সহকারী কমিশনার ভূমি মোঃ শাহ আলম মিয়া

  নরসিংদীর সংবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক/নরসিংদীর সংবাদ-
মাধবদী নরসিংদী প্রতিনিধিঃ কাজকে যিনি ভালবাসেন, সব সময় নিজেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখতে পছন্দ করেন, কাজ না থাকলে যার শরীর ব্যথা করে তিনি নরসিংদী সদর সহকারী কমিশনার ভূমি মোঃ শাহ আলম মিয়া। নিত্য দিনের কাজের ফাঁকে তিনি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে চর্চা করতে ভালবাসেন, “সভ্যতার বেহুদা হালচাষ ও শাহী বেদেনামা” শিরোনামে নরসিংদী চরাঞ্চলের বেদের জীবন চিত্র তুলে ধরেছে তার লেখনিতে।

লোম কাঁটা মিহি হিমেল হাওয়ার পতপত শব্দসুর।মেঘনার জলপেট চিরে দক্ষিণে ধাই ধাই করে চলছে বোট। আবছা অন্ধকার। পশ্চিমাকাশে মাথা তোলা জ্যোৎস্নাপতি। মেঘনার জলের সরলরেখায় উগরে পড়ছে শশীঠাকুরের প্রেমাঞ্জলি। যেন ঢেউয়ে ঢেউয়ে জল-জোছনার জলকেলি লীলা। এ রঙ্গকীয়া দর্শনে বেহুঁশ কচুরিপানাও দ্রুতই ডুব সাঁতারে পথ পাল্টায়ে নেয়। মা ইলিশ রক্ষায় ৩১/১০/২০ তারিখে অভিযান শেষে ফিরছি স্পীডবোটে। বোট সম্মুখে অগ্রসরমান।

নরসিংদীর করিমপুর বাজারের কাছাকাছি আসতেই কূল ঘেঁষা তহশীল অফিসের বিশালাকার মাঠ জুড়ে মৃদু টেপাটেপি-ঢেপাঢিপি লালচে হলুদ আলো। গোটা বিশেক আলো হবে। কৌতুহলবসত গতি কমাতে বললাম। দ্রতই পরিস্কার হলো ঐ আলোকিত অন্ধকার।২০-২৫ টি টাব্বর পাতানো। ওহহ। এতো বেদে বহর।

কিছুটা বিস্ময় ও অজানা আগ্রহ থেকে বোট ভেড়ানো হলো। বহরের দিকে এগিয়ে যেতেই কে যেন আগেই বহরে গিয়ে বেদে সর্দারকে জানাল এসিল্যান্ড স্যার এসেছেন-আপনাদের সাথে কথা বলবেন। শুনেই বেদে সর্দার হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন।
-বললেন স্যার আপনি এছেছেন আমরা খুছি। আমরা বেদে। জায়গা নাই। তাই আপনার জায়গায় টাব্বর(তাবু) পেতেছি।
-আমি বেমালুম। দৃষ্টি আমার সর্দারের টাব্বরে। সরদারনী কেমন আছেন।
-বালই আচি। আফনি?
-আমরাও ভাল। ভিতরে আসতে পারি?
-আসেন।বসেন।

-সরদারনীর ডানে ষোড়শী কন্যা। বামে উঠতি দুই যুবক। সকলেই রাতের ভোজনে ছিল। আমার প্রবেশে কিছুটা জড়সরো। গল্প হলো। তাদের জীবন চরিত জানবার চেষ্টা হলো। হলোও অনেকটা। আন্তরিক। অতিথি পরায়ন। নিখাদ মায়ামাখা চাহনি। শেষে বললাম সাপ খেলা কি রাতে দেখা যায়। (ইতোমধ্যে টাব্বরের বাহিরে সরদার আয়োজন করেছেন মনে হল)
-হুম যায়। আসেন। (বহরে অনেকটা শোরগোল পড়ে গেছে)

বের হতে হতে হঠাৎ টাব্বরের (তাবু বা ছাউনী) পিছন থেকে অষ্টাদশী বেদে কন্যা সুর করে গান ধরলো—
“খা খা খা বক্ষিলারে খা
ঠক বাজ’রে খা
খেলা দেইখা যে পয়সা না দেয়
তারে খা
তারে কাঁচা ধইরা খা”
খা খা খা বক্ষিলারে খা—-

অষ্টাদশীর হাতে কালনাগিনী। সরদার প্রতি তাঁবু থেকে বিচিত্র সাপ নিয়ে আসলো। একে একে দুধরাজ,গোমা,আলাদ,কালচিতি,ঘরচিতি, গোখরা,কেউটে,নাউজালি,শঙ্খিনী,বালুবোড়া,দাড়াশ, দুমুখো দেখা হলো।
হঠাৎ ৫ বছরের বেদেবয় টিকনা প্যান্ট পড়ে লাউডগা নিয়ে হাজির। চক্ষুচড়ক গাছ। এও সম্ভব। ডরহীন। নিষ্পলক। এটাও পেশা। এটাও নেশা। এটাও জীবন।এটাও সাধন।
কিন্তু এ দিয়ে কি এ যুগে ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়। নাকি
সভ্যতার সংকটে তারাও আজ নির্বাক, নিরুপায়, দিকভ্রান্ত।

প্রশ্ন: কতটুকু জানি আমৃত্যু এ জাত বাইদাদের? আসুন একটু জেনে নেই—————————

“বিচিত্র জাত বেদেরা। জাতি জিজ্ঞাসা করিলে বলে, বেদে। তবে ধর্মে ইসলাম। আচারে পুরা হিন্দু, মনসা পূজা করে, মঙ্গলচন্ডী, ষষ্ঠীর ব্রত করে, কালী-দুর্গাকে ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম করে। হিন্দু পুরাণ-কথা ইহাদের কন্ঠস্থ। বিবাহ আদান প্রদান সমগ্রভাবে ইসলাম-ধর্ম সম্প্রদায়ের সঙ্গে হয় না, নিজেদের এই বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ। বিবাহ হয় মোল্লার নিকট ইসলামীয় পদ্ধতিতে, মরিলে পোড়ায় না কবর দেয়।”

বেদেনী,তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়।

বেদে:
ওরা বেদে। সকলেরই অতিপরিচিতজন। তবে কাছেরও নয়, অতি দূরেরও নয়। সম্পর্ক নেই। কিন্তু দৃষ্টি সীমায় ঘুরেফিরে। সামাজিক ভাববিনিময় ঝাপসা-অবয়বহীন। প্রান্তিক। যাযাবর গোষ্ঠী। এরা ভূমিহীন। দলবদ্ধভাবে বসবাস। বাহন নৌকা। জন্ম-বিয়ে-রঙ্গ-মৃত্যু সবি নৌকায়। এজন্য তাদের জলের জিপসিও বলা হয়।

সাপের খেলা দেখানোর জন্যই এরা বেশি জনপ্রিয়। বেদেদের অঞ্চলভেদে বাদিয়া, বাইদ্যা বা বইদ্যানী নামেও ডাকা হয়। এই নামগুলোর উৎপত্তি অবজ্ঞাসূচক বৈদ্য (চিকিৎসক) থেকে। এরা ওঝাঁ বা বিষবৈদ্য নামেও পরিচিত।
প্রাচীনকাল থেকেই বেদেরা কবিরাজি, ঝাঁড়ফুঁকসহ বিভিন্ন হাতুড়ে চিকিৎসার সাথে জড়িত।
অনেকে দাবী করেন, বেদে শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বেদুইন থেকে। আরব বেদুইনদের বেদেরা পরিচয় দেয় নিজেদের পূর্বপুরুষ হিসেবে। এদের আদি নাম মনতং। ১৬৩৮ সালে আরাকানরাজ বল্লার রাজার সাথে তারা প্রথম ঢাকায় আসেন। প্রথমে তারা বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করেন। পরে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। দেশের ৯০% বেদে নিরক্ষর।

গোত্র ও পেশা:
বেদে মেয়েরাই কঠোর পরিশ্রমী। ছেলেরা অলস প্রকৃতির। পেশা বা জীবিকাবাহন অনুযায়ী এদের গোত্র নির্ধারিত হয়। ১৩ টি গোত্র সচরাচর পাওয়া যায়। যথা—

১.মালবেদে—শিংগা দিয়ে রক্ত টেনে ব্যথা নিরাময় করে

২.সাপুড়িয়া—সাপ ধরা , খেলা দেখানো,দাঁতের পোকা ফেলানো ও ঔষধ সাদা লজ্জাবতী,তাবিজ বিক্রি

৩.মেল্লছ বা বাজিকর—যাদু দেখানো

৪.সান্দার বা ধামাধন্নী—মাথায় ধামা বা ঝাঁকা নিয়ে গ্রামে চুড়ি,ফিতা বিক্রি

৫.টোলা—বানর খেলা দেখানো

৬.মিরশিকারী—ভূত-প্রেত ও মৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি

৭.বরিয়াল—বড়শি দিয়ে মাছ ধরা ও বিক্রি

৮.মিচ্ছিগিরি—ভাঙ্গা কাঁচ দিয়ে চোখের অস্ত্রোপচার করে চিকিৎসা

৯.গাইন—ঝিনুক থেকে মুক্তা কুড়িয়ে বিক্রি করে

১০.কুড়িন্দা—হস্তরেখা দেখে ভাগ্য বলে দেয় এবং কূপ-ইন্দিরা-পুকুর থেকে হারানো সোনা/রুপার গহনা কুড়িয়ে দেয়

১১.চাপালি—ঝাঁকায় করে প্রসাধনী বিক্রি

১২.লইয়া বা মানবতা বা বাবজিয়া—খালে বিলে মাছ ধরে

১৩.চামরিমা—শারীরিক কসরত দেখিয়ে জীবিকা অর্জন

শারীরিক বৈশিষ্ট্য:
এদের দেহ সুঠাম। গায়ের রং গভীর কালো

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ওপরে